নামঃ মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাম আপন Md Sazzadul Islam Apon , বয়সঃ ২০- বাসাঃ গাবতলি, বগুড়া। আমার মাধ্যমিকঃ বগুড়া জিলা স্কুল- ২০১৭ সালে জি পি এ ৫, উচ্চমাধ্যমিকঃ বগুড়া সরকারি কলেজ- ২০১৯ সালে জি পি এ ৪.৫০, এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এ গাইবান্ধা সরকারি কলেজ এর অনার্স এর ৩য় বর্ষের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র।
আমার বাবাঃ মোঃ আব্দুল কাইয়ুম তরফদার (৫৪)- ব্যবসায়ী Md. Abdul kaiyum Torofder , মা- মোছাঃ স্বপ্না বেগম(৪৫)- গৃহিণী- Mst. Sopna Begum, আর আমার ছোট ভাইঃ আবিদুল ইসলাম আবিদ- ছাত্র- Abidul Islam Abid(14) – এই মিলে আমাদের পরিবারের সদস্য ৪ জন, মধ্যবিত্ত পরিবার। আমি ২০১৯ এ অনার্স কোর্স শুরু করি- পড়াশুনার জন্য মেস এ থাকতাম- হঠাৎ করেই করোনা মহামারি শুরু হলো, মেস বন্ধ হয়ে গেলো, আমি বাসায় চলে আসলাম। তখন আমার বাসায় কিছু কবুতর এবং শখের পাখি ছিলো, আগে থেকেই আমার পশু পাখি ভালো লাগতো, করোনার সময়টায় সবাই গৃহ বন্দি কাটিয়েছে। আমিও বাসায় বসে থাকতাম আর পড়াশুনা করতাম।
আমি যেহেতু পাখি বা কবুতর পুষতাম সেহেতু এই রিলেটেড ফেসবুক গ্রুপে জয়েন হয়ে থাকতাম। হঠাত করেই আমি কিছু বিদেশি জাতের মুরগি ফেসবুকে দেখতে পারি, এগুলা তখন আমার খুব ভালো লাগে। আমি নাম ও জানতাম না, পরে জানলাম অইটা সিল্কি মুরগি । আসলেই এইটা পৃথিবীর সুন্দর মুরগি গুলোর একটি এবং অনেক জনপ্রিয়। তারপর আমি সিল্কি মুরগি তথ্য কালেক্ট করা শুরু করি, অনেক এই সেল পোস্ট করত ফেসবুক এ- আমি দামের ধারনা নেওয়ার জন্য দাম শুনতাম, আমার অনেক ইচ্ছা হচ্ছিলো নেওয়ার কিন্তু আমার কাছে টাকা ছিলো না। এজন্য কিনতেও পারছিলাম না, আমি অনেক জনের কাছে দাম শুনেছি কিন্তু কিনতে পারিনাই, টাকা ছিলোনা বলে। এমন সময় আমি আমার আম্মুর থেকে টাকা চাই, যে আম্মু আমাকে ২০০০ টাকা দাও আমি কিছু মুরগির বাচ্চা কিনবো। আম্মু আমাকে সেই টাকা টা দিয়ে সাহায্য করে। টাকা পেয়েছি কিন্তু এখন একটা সমস্যা আমার সামনে দাঁড়ায়। আমি সংগ্রহ করবো কিভাবে, কারন আমার টাকা অল্প আবার অনলাইন এ কখনো লেনদেন করিনি। আমার ভয় লাগতো টাকাটা যে কি হয়? তারপর আমি খুজতে থাকি আমাদের জেলা বা জেলার আশেপাশে কে আছে বা কে মুরগি বিক্রি করতে চায়। হঠাত বগুড়ার এক ভাইয়ের (আতাউস সামাদ রাহুল)- পোস্ট দেখতে পারি, আমি তার বাসায়(কৈ -গাড়ি মৎস্য অফিস, বগুড়া) গিয়ে ১০০০ টাকা দিইয়ে ২ টা সিল্কির ১ মাসের বাচ্চা সংগ্রহ করি।
তারপর,
এগুলো বাসায় এনে লালন পালন শুরু করি, যে ভাইয়ের থেকে নিয়েছিলাম (আতাউস সামাদ রাহুল )উনি আমাকে লালন পালনে দিকনির্দেশনা দিয়ে সবসময় সাহায্য করেছিলেন ।এই বাচ্চাগুলো বড় হইতে ৫ মাস সময় লেগে যায়। এদের বয়স যখন৬ মাস হয় তখন এগুলা ডিম দেওয়া শুরু করে- আমি এদের থেকে যে বাচ্চা পেয়েছিলাম কিছু নিজের জন্য রেখে বাদবাকি অনলাইন এ বিক্রি শুরু করি। আমার ২ টা মুরগি থেকে১০ টা বাচ্চা বড় করেছিলাম, সেগুলোও পরবর্তীতে ডিম দেওয়া শুরু করে। আমার তখন নতুন শখ জাগে, আরো নতুন নতুন শৌখিন জাত গুলো সংগ্রহ করার। আমার তখন মুরগি রাখার কোন জায়গা ছিলোনা, কবুতরের বা পাখির খাচায় রাখতাম, আমার বাসার ভিতরে ছোট একটা মাচার ঘর ছিলো, আমি চিন্তা করলাম এইজায়গায় একটা মুরগি রাখার ঘর বানাতে পারি। আমার মুরগি গুলো ডিম দিচ্ছিলো, আমি সেগুলো থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে বাচ্চা বিক্রি করে কিছু টাকা জমায়ে অই মাচার ঘর এ নেট, কাঠ দিয়ে ৩ তাকের ৯ টা ছোট খাচা বানাই- এইটা আমি এবং আমার ছোট ভাই নিজেরাই বানিয়েছিলাম। তারপর আমি আসতে আসতে নতুন জাত কেনা শুরু করি। ব্রাহামা এনেছিলাম তারপর। আমার বাবা এসব কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। আমাকে বলতো তুমি জিলা স্কুল এর স্টুডেন্ট হয়ে মুরগি বেচো, এইটা কোন কথা? তুমি ইংরেজিতে অনার্স করছো আর তুমি মুরগি পালতেছো,বিক্রি করতেছো। একদিন আমি ডেলিভারি দিয়ে বাসায় ফিরছিলাম বাবার দোকান এ যাই, আব্বু বলবো কই গিয়েছিলে? আমি বললাম কিছু মুরগি বাচ্চা ঢাকায় পাঠাইতে, উনি বললো টাকা দিয়েছে? নাকি এমনি পাঠায় দিলা? আমি বললাম টাকা দিয়েছে বিকাশে- উনি বিশশাস করতে পারেননাই। আমাকে বলতেছে বিকাশের ব্যালান্স দেখাও তো। তারপর উনি ব্যালান্স দেখে বিশাস করলেন যে অনলাইনেও এগুলো বিক্রি হয়। আর কিছু বললোনা শুধু বললো পড়ালেখা ভালো করে করো।
তারপর বেন্তাম, কোচিন, ফাইটার আরো কিছু ডিমের মুরগি সংগ্রহ করি। আমার মুরগির বাচ্চা তখন অনলাইনে ভালোই বিক্রি হচ্ছিলো। বিক্রি করে যে টাকা পাচ্ছিলাম সেইটা দিয়ে ওদের খাবার ঔষধ আর আরো নতুন জাত সংগ্রহ করছিলাম। এমন সময় আমার ছোট্ট খামার টি ভরে গেছে । মুরগি রাখার আর জায়গা নাই। আমার বাবার আমার বড় বড় ব্রাহামা মুরগি গুলো খুব ভালো লাগে, উনি আস্তে আস্তে আমাকে সাপোর্ট করা শুরু করে। ওনার ও মুরগি গুলো ভালো লাগে। উনি আমাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে চেয়েছে। কিন্তু আমি একটাকাও না নিয়ে মুরগির বাচ্চা বিক্রি করে আরো নতুন জাত সংগ্রহ করেছি। আমার বাবার ষ্টেশনারির দোকান পাশাপাশি বিকাশ ও আছে- আমি দেখলাম আমার বাবার কোন এন্ড্র্যেয়েড মোবাইল নাই, বাটন ফোন এ বিকাশ ব্যবহার করলে চারজ বেশি কাটে- এপ এ কম কাটে- আমার এই বিষয়টা খুব খারাপ লাগে- আমি কিছু মুরগি এবং বাচ্চা সেল করে আব্বুকে একটা মোবাইল কিনে দেই – এইটা ছিলো আব্বুকে দেওয়া আমার প্রথম উপহার। আব্বু অনেক খুশি হয়েছিলো- আমার ও অনেক ভালো লাগে- আস্তে আস্তে আমি নিজের পড়াশুনার খরচ নিজে বহন করা শুরু করি। আব্বুর থেকে আর কোন খরচই নেই না।
তারপর আমার ছোট ভাইয়ের পড়াশুনার এবং ওর সব কিছুর দায়িত্ব নেই। এবং আমার পরিবারকেও সব দিক থেকে সাহায্য শুরু করি।
ছোট্ট খামার এদিক ভরে গেছে আর জায়গা নেই, এমন সময় আব্বু নিজেই বল্লো নতুন একটা খামার বানাই, আমাদের বাসার ভিতরেই লম্বা২০ ফিট প্রস্থ ১০ ফিট এর খামার বানাই, আগের মতোই এখানেও ৩ টা তাক মানে ৩ তালা খামার আর মোট খোপ হয় ১৮ টা –
এই খামার বানাতে খরচ হয়েছিলো ৬০ হাজার টাকা- তারপর আমি আরো নতুন নতুন জাত -ব্রাহামা, সিল্কি, কোচিন, বেন্তাম, পলিশকেপ, ফ্রিজেল, ফনিক্স, ইয়োকোহামা,অনাগাদুরি, মালয়েশিয়ান শো৩২.০ শেরেমা, সেব্রাইট, হোয়াইট ফেস স্পানিশ, রোসকম্ব, সুমাত্রা, ফাইটার, সংগ্রহ করতে থাকি, এখন আমার খামারে ২৮ প্রাজাতির মুরগি আছে। এডাল্ট মুরগি গুলোর জোড়া ৪০০০ থেকে ৩০০০০ টাকা পযন্ত হয়ে থাকে।
এখন আমার খামারে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট মুরগি – মালয়েশিয়ান শো শেরেমা এবং সবচেয়ে বড় মুরগি- আমেরিকান ব্রাহামা আছে- এগুলো থেকে আমি প্রতিনিয়ত বাচ্চা পাচ্ছি। প্রতিদিন আমি খামার থেকে ডিম সংগ্রহ করি ১০-১৫ টা, প্রতি সপ্তাহে বাচ্চা উৎপাদন হয় ৫০-৬০ টা । যা আমি বিক্রি করি ৬০০-২০০০ টাকা জোড়ায়। মাসে ৪০-৬০ হাজার টাকা আমি খামার থেকে পাই। এই বাচ্চা বা বড় মুরগি গুলো আমি এখন পযন্ত ৬৪ টা জেলায় পৌছায় দিতে সক্ষম হয়েছি। আমি ইতিমধ্যে ৪৫০০ টি ডেলিভারি সম্পন্ন করেছি। এগুলো বাসের মাধ্যমে ডেলিভারি দিয়ে থাকি। যেহেতু আমার মুরগি গুলো শখের মুরগি সেহেতু আমি আমি শখের মুরগিওয়ালা https://www.facebook.com/sokhermurgiwala1 নামে ফেসবুক পেইজ এবং ইউটিউব চ্যানেল খুলেছি। আমার নতুন ওয়েবসাইট খুলেছি ইতিমধ্যে- https://sokhermurgiwala.com/ যেখানে সবসময় মুরগি পালন এর সকল যাবতীয় তথ্য দেওয়া দেওয়া হয়। আমার ফেসবুক পেইজ এ এখন ১ লক্ষ এর পরিবার আর ইউটিউব চ্যানেল এ আমার খামারের সব আপডেট ভিডিও দিয়ে থাকি। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে থেকে প্রতিদিন আমার খামার দেখতে তরুন উদ্দোক্তারা আসে। তারা এসে ফারম দেখে বাচ্চা বা বড় মুরগি সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। আমার খামারে এখন ১২ জন বেকার যুবক কাজ করছে।
আমার অর্জন ঃ আমি শৌখিন মুরগির একজন সফল ব্রিডার হতে পেরে আমার অনেক ভালো লাগে। ২০২৩ এ ইতিমধ্যে উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে আমি ২ টা পুরস্কার পেয়েছি- প্রানীসম্পদ প্রদর্শনী তে। ২০২৪ এ জাতীয় পর্যায়ে- জাতীয় প্রানিসম্পদ প্রদর্শনী মেলা, আগারগাও থেকে আমি ১ম স্থান অধিকার করেছি ।
ইনশাআল্লাহ আপনাদের দোয়া এবং ভালোবাসা থাকলে আরো অনেক দূর এগিয়ে যাব।

আমার ইচ্ছা আমি আরো বড় আকারে একটা বিদেশি শৌখিন মুরগি খামার দিব। ইতিমধ্যে আমি আমার সম বয়সী ৮ জন বেকার যুবক এর কর্মসংস্থান এর ব্যবস্থা করেছি । তারা আমার খামার এর বাচ্চা নিয়ে লালন পালন করে বিক্রি করে লাভবান হচ্ছে।
ইনশাআল্লাহ আমি ভবিষ্যতে আরো অনেক বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান করব।

তরুন উদ্দোক্তা বা আরো কেউ যদি এসব মুরগি লালন পালন করতে চায়- তাদের আমি বিদেশি মুরগি পালন সম্পর্কিত সকল তথ্য দিয়ে সাহায্য করে থাকি। আমি তাদের বলবো আপনারা চাইলে ২ টা দেশি মুরগির বাচ্চা দিয়ে শুরু করে দেখতে পারেন আপনারা লালন পালন করতে পারছেন নাকি তা দেখতে হবে আগে। তারপর শৌখিন মুরগি সংগ্রহ করুন। অনেক এ আবার ভাববেন একবারে লাখ টাকার মুরগি কিনব আর হয়ে যাবে – এমন কিছু না- ২ টা বা ৪ টা দিয়ে শুরু করুন। ইনশাআল্লাহ ভালো ফলাফল পাবেন।
আর এই মুরগি গুলো আমাদের বিনোদনের ভালো মাধ্যম হয়ে উঠেছে। শহরের কর্ম ব্যস্ত জীবনে অনেকেই বাসার বেল্কুনিতে বা ছাদে বা ছোট জায়গায় ছোট খাচায় করে পুষছে। এদের নান্দনিকতা, সৌন্দর্য এবং গতিবিধী মানুষের মনকে আনন্দ দেয়। আমার অনেক কাস্টমার আমাকে জানায় -আমি সময় পেলেই আমার মুরগির খাচার কাছে গিয়ে তাকিয়ে থাকি এবং দেখি ওরা কি করছে?
আমি মনে করি আমাদের দেশের অনেক যুবক বসে না থেকে যে যেই বিষয়ে দক্ষ সেই বিষয়ে কাজ শুরু করুক। বাধা বিপত্তি আসবেই সেগুলো মোকাবেলা করে সফলতার চুড়ায় পৌছাতে হবেই।




















